binodon5
ট্রাক
থেকে নামছে শামিয়ানা। নামানো হচ্ছে ডেকোরেটরের নানা সামগ্রী। যে বাড়ির
সামনে এই আয়োজন, তার নাম ‘বেদান্ত’। নম্বর ৫২/৪/১। পাশাপাশি কয়েকটি ভবন।
মহানায়িকা সুচিত্রা সেন থাকতেন এখানে।
অন্তরালে যাওয়ার পর থেকেই
সুচিত্রার বাড়ির সামনে ভিড় করতেন গুণমুগ্ধরা। শুধু স্বপ্নের নায়িকাকে একবার
চোখের দেখা দেখার জন্য। গতকাল রোববার মহানায়িকার মৃত্যুর দুই দিন পরেও
ভক্তদের ভিড় করতে দেখা গেল বাড়ির সামনে। তাঁদের হাতে নানা রকমের ফুলের
তোড়া। আগেও সুচিত্রাভক্তরা নানা উপহার নিয়ে আসতেন তাঁকে দেওয়ার জন্য।
কিন্তু কোনো দিনই সেসব উপহার নিরাপত্তার ঘেরাটোপ টপকে তাঁর কাছে পৌঁছাত না।
গতকালও ভক্তদের ফুলের তোড়াগুলো সেই বাধা টপকাতে পারল না।
আজ সোমবার
মহানায়িকার পারলৌকিক কাজ। তাই বেদান্ত আবাসনের ছাদে শামিয়ানা তৈরির কাজ
চলছে। তিন হাজার বর্গফুটের ‘তিন-ডি’ ফ্ল্যাটে (এ ফ্ল্যাটেই থাকতেন সুচিত্রা
সেন) চলছে গোছানোর কাজ। বাড়ির সামনে পুলিশের পাহারা। যে ফ্ল্যাটে সুচিত্রা
থাকতেন, সেখানে বাইরের কারোরই প্রবেশের অনুমতি মিলছে না। উৎসুক ভক্তদের
পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা বাড়ির সামনে রাস্তায় অপেক্ষা করছেন। তবে
সুচিত্রা সেন কিংবা তাঁর মেয়ে মুনমুন সেনের ফ্ল্যাটে রোববার টালিউডের বিশেষ
কোনো তারকাকে আসতে দেখা যায়নি।
বেদান্ত আবাসনের ভেতরে থেকে যেসব কর্মী
বাইরে আসা-যাওয়া করছেন, তাঁরা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তেমন কথা বলছেন না। জানা
গেছে, পরিবারের পক্ষ থেকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে
মহানায়িকাকে নিয়ে আলোচনা না করতে। কিন্তু সংবাদকর্মীদের কি আর চেষ্টার কমতি
আছে! তা ছাড়া, ওই বাড়ির দীর্ঘদিনের মালি জয়ন্ত বিসওয়াল কিংবা
বিদ্যুৎমিস্ত্রি শ্যামল মণ্ডলদের যে বলার মতো অনেক কিছুই আছে মহানায়িকা
সম্পর্কে। অনুরোধ না এড়াতে পেরে দু-এক কথা বললেন তাঁরা। শ্যামল মণ্ডল
জানালেন, মহানায়িকাকে তিনি মা বলে ডাকতেন। অনেকবার কথা হয়েছে। দেখা হলেই
তাঁর পরিবারের খোঁজ নিতেন।
মালি জয়ন্তর কষ্টের সঙ্গে আক্ষেপও রয়ে গেছে।
চলে যাওয়ার আগের দিন মহানায়িকা কিছুটা সুস্থ হয়েছিলেন। বলেছিলেন বাড়ি
ফিরবেন। কিন্তু ফিরলেন না। বাগান থেকে সুচিত্রা সেনের পছন্দের ফুলগুলো তুলে
জয়ন্ত সাজিয়ে রেখেছিলেন তাঁর ঘরের দরজার সামনে।
মহানায়িকা
ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই মন ভার ছিল বেদান্ত আবাসনের কর্মীদের।
অন্তরালে থাকা সুচিত্রার কাছে মাঝেমধ্যেই ডাক পড়ত তাঁদের অনেকেরই। যেমন
তত্ত্বাবধায়ক রামকৃষ্ণ সাউ, মালি জয়ন্ত বিসওয়াল, নিরঞ্জন বিসওয়াল, মুনমুন
সেনের গাড়িচালক অবিনাশ তাঁর কাছাকাছি যেতে পারতেন। মালি জয়ন্ত আবদার
করেছিলেন অসুস্থ নায়িকাকে একটিবার দেখতে যাবেন। মুনমুন সেনের সম্মতি নিয়ে
গত বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় তাঁরা গিয়েছিলেন বেল ভিউ ক্লিনিকে। জয়ন্তর
বর্ণনায় জানা যায়, কেবিনের সামনে দাঁড়াতেই স্মিত হেসে সুচিত্রা জয়ন্ত
বিসওয়ালের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘এসেছিস তোরা? আয় ভেতরে আয়।’
মালি
জয়ন্ত জানালেন, সুচিত্রা সেন ফুল খুব ভালোবাসতেন। বাগানে নতুন ফুল ফুটলেই
তিনি দিয়ে আসতেন। দু-এক সপ্তাহ ফুল নিয়ে না গেলে তিনি নিজেই
নিরাপত্তারক্ষীদের ফোন করে আমাকে ডেকে পাঠাতেন। মৃদু ধমক দিয়ে বলতেন, ‘কী
রে, ফুল কোথায় আমার?’ সুচিত্রার জানালা দিয়ে বাগান দেখা যেত। তাঁর সব
জানালাই পর্দায় ঢাকা থাকত। শুধু বাগানের দিকেই জানালার পর্দা সরানো থাকত।
জয়ন্ত বলেন, ‘বাগানে কাজ করতে করতে আমি কত দিন দেখেছি, তিনি জানালায় বসে
ফুলের বাগান দেখছেন। বাগানে ফুল ফুটে আছে এখনো, কিন্তু মানুষটি নেই।’
সুচিত্রার
ঘরে এখনো আলো জ্বলছে। জানা গেছে, মেয়ে মুনমুনের নির্দেশে গেল শনিবার
দুপুরেই সুচিত্রা সেনের ফ্ল্যাটের কেটে যাওয়া কয়েকটি বাল্ব পাল্টে দিয়ে
এসেছেন বিদ্যুৎমিস্ত্রি শ্যামল। তিনি জানালেন, ওই দিন থেকে অবিরাম আলো
জ্বলছে মহানায়িকা যে ঘরে থাকতেন, সেই ঘরে। তাই নতুন বাল্ব লাগানো হয়েছে।
তবে পারলৌকিক কাজের পর থেকে অন্ধকারে ডুবে যাবে নায়িকার ঘর। সেখানে আলো
জ্বালানোর মানুষটি আর নেই।
এদিকে কলকাতা নগরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে
সুচিত্রা সেনের বিশাল আকৃতির ছবি স্থাপন করা হয়েছে। শনিবার সেখানে অনেকে
মালা দিয়েছেন। গতকাল রোববারও মহানায়িকার ছবির সামনে ফুল দেওয়া অব্যাহত ছিল
ভক্তদের।
No comments:
Post a Comment